লো ব্লাড প্রেসার বা নিম্ন রক্তচাপ অনেকের কাছেই তেমন ভয়ের বিষয় মনে হয় না। কিন্তু বাস্তবে এটি হঠাৎ মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—এমনকি গুরুতর জটিলতার কারণও হতে পারে। অনেকেই ভাবেন, “ব্লাড প্রেসার কম তো ভালো!” কিন্তু সব সময় তা নয়। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে বিপদ হতে পারে।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানবো—লো ব্লাড প্রেসার কী, কেন হয়, কী কী লক্ষণ দেখা যায়, হঠাৎ কমে গেলে কী করবেন, ঘরোয়া সমাধান কী এবং কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন।
লো ব্লাড প্রেসার কত হলে ধরা হয়?
সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ ধরা হয় ১২০/৮০ mmHg।
যখন রক্তচাপ ৯০/৬০ mmHg বা এর নিচে নেমে যায়, তখন তাকে লো ব্লাড প্রেসার (Hypotension) বলা হয়।
তবে সবার শরীর একরকম নয়। কারও স্বাভাবিক প্রেসারই একটু কম হতে পারে এবং তাতে কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। কিন্তু যদি এর সাথে উপসর্গ দেখা দেয়—তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার।
লো ব্লাড প্রেসারের সাধারণ লক্ষণ
লো ব্লাড প্রেসার হলে শরীর বিভিন্নভাবে সংকেত দেয়। যেমন—
- মাথা ঘোরা
- ঝাপসা দেখা
- দুর্বল লাগা
- বমি বমি ভাব
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- বুক ধড়ফড় করা
- ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে ত্বক
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
অনেক সময় হঠাৎ বসা বা শোয়া থেকে দাঁড়ালে মাথা ঘোরে। এটিকে বলা হয় অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন।
লো ব্লাড প্রেসারের কারণ কী?
লো ব্লাড প্রেসারের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন—
১. পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)
গরমে বেশি ঘাম, ডায়রিয়া, বমি বা পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি হলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
২. রক্তক্ষরণ
দুর্ঘটনা বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হলে রক্তের পরিমাণ কমে যায়, ফলে প্রেসার নেমে যায়।
৩. হৃদরোগ
হৃদযন্ত্র ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে প্রেসার কমে যেতে পারে।
৪. হরমোনজনিত সমস্যা
থাইরয়েড বা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা থাকলে লো ব্লাড প্রেসার হতে পারে।
৫. গর্ভাবস্থা
গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা পরিবর্তনের কারণে সাময়িকভাবে প্রেসার কমতে পারে।
৬. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হাই ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, ডিপ্রেশনের ওষুধ বা কিছু হার্টের ওষুধ প্রেসার কমিয়ে দিতে পারে।
হঠাৎ লো ব্লাড প্রেসার হলে কী করবেন?
যদি হঠাৎ মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা শুরু হয়, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপ নিন—
✅ ১. সঙ্গে সঙ্গে বসে বা শুয়ে পড়ুন
পা দুটো সামান্য উঁচু করে রাখুন। এতে মস্তিষ্কে দ্রুত রক্ত পৌঁছাতে সাহায্য করে।
✅ ২. পানি পান করুন
এক গ্লাস পানি ধীরে ধীরে পান করুন। শরীরে পানি কমে গেলে দ্রুত কিছুটা উন্নতি দেখা যায়।
✅ ৩. লবণযুক্ত কিছু খান
হালকা লবণ মেশানো পানি বা স্যালাইন খেতে পারেন (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী)। লবণ সাময়িকভাবে প্রেসার বাড়াতে সাহায্য করে।
✅ ৪. হঠাৎ উঠে দাঁড়াবেন না
শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উঠুন।
✅ ৫. প্রয়োজনে সাহায্য নিন
অজ্ঞান হয়ে গেলে বা বারবার এমন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।

ঘরোয়া উপায়ে লো ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত সমস্যা হলে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে উপকার পেতে পারেন।
১. পর্যাপ্ত পানি পান
প্রতিদিন ২.৫–৩ লিটার পানি পান করুন (শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী)।
২. ছোট ছোট ভাগে খাবার খান
একসাথে বেশি খাবার না খেয়ে ৩–৪ ঘণ্টা পরপর অল্প করে খাবার খান।
৩. লবণের পরিমাণ বাড়ানো (ডাক্তারের পরামর্শে)
যাদের প্রেসার সবসময় কম থাকে, চিকিৎসক সামান্য লবণ বাড়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন।
৪. ক্যাফেইন
চা বা কফি সাময়িকভাবে প্রেসার বাড়াতে পারে। তবে অতিরিক্ত নয়।
৫. কম্প্রেশন স্টকিং ব্যবহার
যাদের পায়ে রক্ত জমে যায়, তাদের জন্য বিশেষ স্টকিং উপকারী হতে পারে।
কোন খাবার লো ব্লাড প্রেসারে ভালো?
- ডাবের পানি
- লেবু-লবণ পানি
- কলা
- খেজুর
- ডিম
- স্যুপ
- লাল মাংস (পরিমিত)
- বাদাম
এসব খাবার শরীরে শক্তি জোগায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
- বারবার অজ্ঞান হওয়া
- বুক ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- তীব্র মাথাব্যথা
- বিভ্রান্তি বা কথা জড়িয়ে যাওয়া
এগুলো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় লো ব্লাড প্রেসার
গর্ভাবস্থায় প্রেসার কমা খুবই সাধারণ বিষয়। তবে অতিরিক্ত মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি পান জরুরি।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা
বয়স্কদের ক্ষেত্রে লো ব্লাড প্রেসার পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই—
- বাথরুমে গ্র্যাব বার ব্যবহার
- ধীরে ধীরে হাঁটা
- নিয়মিত প্রেসার মাপা
এসব অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
লো ব্লাড প্রেসার কি সবসময় খারাপ?
সব সময় নয়। অনেক অ্যাথলেট বা সুস্থ মানুষদের স্বাভাবিক প্রেসারই কম থাকে। যদি কোনো উপসর্গ না থাকে, তাহলে সাধারণত সমস্যা নেই।
প্রতিরোধের উপায়
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম
- পর্যাপ্ত ঘুম
- সুষম খাদ্য
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে না থাকা
- অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
উপসংহার
লো ব্লাড প্রেসার অনেক সময় তুচ্ছ মনে হলেও, এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। হঠাৎ মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগলে অবহেলা করবেন না। দ্রুত বসে পড়ুন, পানি পান করুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত জীবনযাপন এবং সচেতন থাকলে লো ব্লাড প্রেসার সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।